স্টাফ রিপোর্টার :- গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহের কাজের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা বেশি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষ ওই ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছে বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে। কাজ না পাওয়া ঠিকাদারদের অভিযোগ, সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় নিম্নদরদাতাকে কাজ না দিয়ে তৃতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। দুই থেকে তিন কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রকল্প পরিচালক ও দরপত্র কমিটির সভাপতি এ কে এম হারুনুর রশীদ এবং সদস্য সহকারী প্রকৌশলী হাসিবুল ইসলাম ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক এ কে এম হারুনুর রশীদ বলেছেন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ মোটেও সত্য নয়। নিয়ম মেনেই ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এলাকা দুটিতে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। দুই অঞ্চলের ১০ কিলোমিটার এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য জাইকার অর্থায়নে নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। ই-জিপির (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে আহ্বান করা দরপত্র বিক্রি, দাখিল ও খোলার শেষ সময় ছিল ওই বছরের ১৬ অক্টোবর। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দরপত্রে মোট পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং, পূর্বাচল ডিলারস লিমিটেড ও এসটিসিএল, এফএসএল ও এসজেসি, জিলানি ট্রেডার্স-এসএম এন্টারপ্রাইজ-ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রি এবং আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড। এদের মধ্যে সর্বনিম্ন ২৩ কোটি ৪৮ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮ টাকার দর দেয় প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কাজটি তাদের না দিয়ে ৩ কোটি ৬৭লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৯ টাকা বেশি দর দেওয়া তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান এফএসএল ও এসজেসিকে কাজ করার অনুমোদন দেয়। ঠিকাদারদের অভিযোগ, এখানে ক্রয় নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে। কী কারণে অন্য ঠিকাদারদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি মৌখিকভাবে, চিঠিপত্র বা ই-মেইলে জানানো হয়নি। দরপত্র কমিটির কাছে জানতে চাইলেও তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। প্রথম ও দ্বিতীয় নিম্নদরদাতাকে কাজ না দিয়ে তৃতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে দরপত্র কমিটির সভাপতি হারুনুর রশীদ এবং সদস্য সহকারী প্রকৌশলী হাসিবুল ইসলাম ওই কাজ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ সুযোগ নিয়ে তৃতীয় নিম্ন দরদাতাকে কাজ দিয়েছে।
প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নূরুল ইসলাম বলেন, দরপত্রের শর্তানুযায়ী যাবতীয় তথ্য-উপাত্তসহ দলিলাদি ই-জিপি সিস্টেমে জমা দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় সব সঠিক পাওয়া সত্ত্বেও তাদের অযোগ্য দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বলেন, প্রকল্প কমিটির সভাপতি এ কে এম হারুনুর রশীদ ও সদস্য হাসিবুল ইসলাম আমাকে জানিয়েছেন, এই কাজ করতে ১৭ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা লাগে। সেটা আমার প্রতিষ্ঠানের নেই। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানের ১৭ কোটি ৪৪ লাখ ৯১ হাজার টাকার কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তারপরও কাজটি আমাকে না দিয়ে ৩ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে কাজটি দেওয়া হয়েছে তৃতীয় নিম্নদরদাতা প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। এ জন্য প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আদালতে যাব। দরপত্রে দ্বিতীয় নিম্নদরদাতা প্রতিষ্ঠান পূর্বাচল ডিলারস লিমিটেড ও এসটিসিএলের নির্বাহী পরিচালক হাসান আলী খান বলেন, প্রথমজন কোনো কারণে বাতিল হলে কাজটি দ্বিতীয় দরদাতা হিসেবে আমাদের পাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেয়নি। তবে কী কারণে কাজটি আমাদের দেওয়া হলো না, তার ব্যাখ্যাও সিটি করপোরেশন আমাদের দেয়নি। অভিযোগের বিষয়ে এ কে এম হারুনুর রশীদ বলেন, প্রকল্পের জন্য যেসব যোগ্যতা থাকা দরকার, সেই যোগ্যতা নিম্নদরদাতা প্রতিষ্ঠানের নেই। দ্বিতীয় নিম্নদরদাতা প্রতিষ্ঠানেরও একই সমস্যা। এ জন্য তৃতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। দুদকে অভিযোগ করাটা তাঁর ঠিক হয়নি। উনি অন্য দপ্তরেও যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি কেন সেখানে গেলেন? তিনি বলেন, আমি তো মানুষ। আমার তো ভুল হতে পারে। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়ে যে অভিযোগ করেছে, তা মোটেও সত্য নয়। নিয়ম মেনেই ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ হাসিবুল ইসলাম বলেন, নিম্নদরদাতা প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আগে এমন কাজের অভিজ্ঞতার সনদ না থাকায় তাদের কাজটি দেওয়া হয়নি। টাকা নিয়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবে এটা সত্য যে তৃতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়ায় প্রায় তিন কোটি টাকা বেশি লাগবে। এতে অবশ্য সিটি করপোরেশনের কোনো সমস্যা নেই।