
মোঃ হাসানুর জামান বাবু
এদেশে রাজনৈতিক চাটুকারিতা শুরু হয়েছিল খুব সম্ভব পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সেনাপতি ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে। এককথায় বলাচলে তিনি ছিলেন তোষামোদ, তেলবাজী চাটুকারিতা সৃষ্টির পথ প্রদর্শক।
আইয়ুব খান আবার ফিল্ড মার্শাল ছিলেন ( ১৯৬৫ সাল থেকে) । তাও আবার স্বঘোষিত!! যদিও ফিন্ড মার্শাল হয়ে গেলে বড় দুটি যুদ্ধ জয়ের রেকর্ড থাকতে হয়, কিন্তু তার একটিও ছিল না। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ তো সোভিয়েতের চাপে তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। আর কোন যুদ্ধ!!???
সেই মি. ফিল্ড মার্শাল ছিলেন খুবই হামবড়া স্বভাবের। নিজেকে তাবৎ পশু ও সমুদ্রের মৎসকুলের অধিশ্বর বলে মনে করতেন!! শুধু তাই নয় তিনি সর্বদাই চাইতেন সবাই যেন তার তোষামোদ করে। স্কুলের বাচ্চাদের রোদের মধ্যে দাড় করিয়ে পতাকা হাতে নিয়ে ইলি-বিলি খেলা তার আমল থেকে শুরু হয়েছিল, শুরু হয়েছিল তোরণ নির্মান। বারবার তোরণ নির্মানের ঝামেলার পাট চুকাতে দেশের বহু স্থানে তৈরি হয়েছিল স্থায়ী তোরণ। যশোরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মোড়ে যশোর ক্লাবে যাওয়ার রাস্তায় কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে সেই স্থায়ী তোরণ, যদিও বর্তমানে সেটি রঙ-বে-রঙের পোষ্টানে সজ্জিত।
চাটুকারেরা ছিল আইয়ুব খানের প্রথম পছন্দের মানুষ।
একদা এক চাটুকার নাক বলেছিল “স্যারের সবথেকে বড় দিক হচ্ছে তিনি যাই পছন্দ করুক না কে, তেলবাজদের একদমই পছন্দ করেন না”। এটা শুনে খান সাহেব বেজায় খুশি হয়েছিলেন। পিট চাপড়ে সেই চাটুকারকে বলেছিলেন ” তুমনে ইয়ে বাত বিলকুল সেহি বোলা”!!
মানুষ মরে যায়, চলে যায় কিন্তু রেখে যায় তার স্মৃতি/দুঃস্মৃতি । মাঝে মাঝে কিছু মানুষ তাদের প্রেতাত্মাও রেখে যায়। আইয়ুব খান সেই সব মানুষের মধ্যে একজন যায় প্রেতাত্মা এখনো এই বাংলায় ঘুরঘুর করছে।
দেশের মানুষ নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য, দলীয় পদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে, কিংবা কারো পছন্দের পাত্র হবার আশায়, ঠেকায় পড়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় বর্তমান নেতা নেত্রীদের বিভিন্ন ভাবে তোষামোদ করে চলেছে। চাটুকারেরা তাদের দিচ্ছে বিভিন্ন উপাধি। নামকরণ করে চলেছে বিভিন্ন বিশেষণে। যেমন, অমুক নেত্রী, অমুক রত্ম, তমুক পাথর , অমুক মানশ পুত্র/কন্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। জন্মদিনে সবাই মিলে কাটছে কেক। নেতার বয়স ৩০, কেকের ওজন ৩০ পাউন্ড, নেতার বয়স ৫০ কেকের ওজন ৫০ পাউন্ড। নেতা/নেত্রী আসুক আর নাই বা আসুক, কেক কাটা চাই। সঙ্গে চলবে ফটগ্রাফারের ক্লিক ক্লিক, কারণ পত্রিকায় আসতে হবে তো, নাহলে নেতা জানবে কিভাবে?? আর ফেসবুকে তো দিতে হবে অবশ্যই। লাইকের বন্যাকে মহাপ্লাবনে পরিণত করতে হবে না??
কিন্তু দেশের মূল নেতা/নেত্রীদের বুঝতে হবে, এই চাটুকারেরাই যে তাঁর এবং তার দলীয় আদর্শকে নষ্ট করছে আর দলীয় আদর্শ নিয়ে ব্যবসার পসরা সাজিয়েছে, তাঁর আদর্শকে বিক্রি করে গোছাচ্ছে নিজেদের আখের। আর ক্ষতি করছে সেই দলের আর দেশের। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণ, বিপদে এই চাটুকারদের পাওয়া যাবে না। টিনের চশমা পরে ঘুরে বেড়াবে এরা। এদের চাটুকারিতা দেখে আবেগে আপ্লুত না হয়ে এর লাগাম টেনে দরুন এখনি, অন্যথায় অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কথা গুলো বলতে বাধ্য হলাম এই কারণে যে,গত একবছর আগে আমি একটি বিষয়ে হঠাৎ যেতে হলো চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতার বাসায় (পটিয়া উপজেলায় ঐ নেতার পৈত্রিক বাড়ি)যেতে হয়েছিলো।কথা এই মূহুর্তে বলার আসল কারণ হচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্ভবত শীঘ্রই দেশের প্রতিটি উপজেলা পৌরসভা কমিটি হবে এবং এরপর পরে ইউনিয়ন কমিটি গুলো করার কার্যক্রম শুরু করবেন উপজেলার নবগঠিত কমিটি। এর মধ্যে যাতে কোন চাটুকারিতার প্রভাবে কেউ কোন সুবিধাদি সুযোগ মৌসুমী নেতাকে পদপদবী দেওয়ার ক্ষেত্রে সজাগ সচেতন থাকেন। কয়েকদিন পর হয়তো চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার আওতাভুক্ত উপজেলা পৌরসভা বিএনপির কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুধু হবে একটি বিএনপির বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।সকলের মাথায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কমিটির মধ্যে একটা পদপদবী পাওয়ার আশা। তাই যে কোন ভাবে নেতাকে খুশি রাখতেই হবে।
আমি যখন নেতার বাসায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে আটটা। নেতাজি উনার সিংহাসনে পায়ের উপর পা তুলে বলে আছেন। আশেপাশে পাঁচ ছয়জন নেতাকর্মী বসে বিভিন্ন রকম তৈলমর্দন কথা বার্তা বলে নেতাকে খুশি রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে দেখি কিছুক্ষণ পরপর লোকজন আসতে থাকে। তবে অবাক হলাম কিছু দৃশ্য দেখে!! কেউ নেতার দরবারে খালি হাতে আসেনি।
দুইজন কে দেখলাম বড়বড় বাংলা কলা আর একেবারে কুচি ডাব নিয়ে বাসায় ডুকলেন এবং নেতাজির হাতে বুঝিয়ে দিলেন,নেতাজি দেখে খুশি হয়ে কর্মচারী দিয়ে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর আর দুইজন আনলেন গাছের পেয়ারা,আঙুল,বউয়ের বানানো নাস্তা। তা-ও নেতাজি কে দেখিয়ে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর আর তিনজন আনলেন রান্না করা মেজবানি গরুর মাংস নলার ঝোল,সাদা ভাত,মুখ ডাল। তাও নেতাজি কে দেখিয়ে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন।এর পরেরজন আনলেন বড়বড় দুটি পাকা পেঁপে ও একটি তরমুজ, আর ছানার মিষ্টি। নেতাজি এগুলো দেখে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন।
এভাবে আমি একঘন্টার মতো নেতাজির বাসায় বসা অবস্হায় পরিবারে জন্য এমন কোন জিনিস নেই ০৫ আগস্ট-২৪ এর আগে যারা আওয়ামিলীগ নেতা কর্মী সমর্থক ছিলেন এবং বর্তমান বিএনপি যুবদল ছাত্রদল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মী হয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন উনারা উপহার হিসেবে আনেনি। পরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম নেতা দক্ষিণ জেলা বিএনপি পদ পাওয়ার পর থেকে আর নিজের বাসায় ভাত রান্না করে খেতে হচ্ছে না। এবং অন্যান্য কোন প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে হচ্ছে না। সবকিছু পদপদবীর আশায় হুজুরা খানায় পৌঁছে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের দোসরা।আর এগুলো দেখে স্বচক্ষে পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখলাম নেতা মহা খুশি। এরমধ্যে আবার দুইজনের কাজ থেকে ক্যাশ টাকাও নিলেন। একজনের থেকে নিলেন একটি কাগজে সুপারিশ করে। আরেকজন থেকে নিলেন একটি কাজ করে দেওয়ার কথা বলে।
এখন আপনারই চিন্তা করে দেখেন আমরা কাকে নেতা বানাচ্ছি এবং এই রকম নেতার কাছে নেতাকর্মী সমর্থন দেশ জনগণ সাধারণ মানুষ কি আশা করতে পারে??
♟️♟️♟️
“কিন্তু দেশের মূল নেতা/নেত্রীদের বুঝতে হবে, এই চাটুকারেরাই যে তাঁর এবং তার দলীয় আদর্শকে নষ্ট করছে ”
-কোন দলের কি আদর্শ রয়েছে, যা আবার নস্ট করাও সম্ভব; আপনি আমাকে চিন্তিত করলেন।
কে কত দিন রাজনীতিতে টিকবেন?, পদ পাবেন? সেটা দলীয় হাইকমান্ডকে তোষামোদ করার উপর নির্ভর করে?নাকি এই নেতার বাসায় বস্তায় বস্তায় ভরে পাঠানোর উপর নির্ভর করে?
: যতদিন ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে অগ্রাহ্য করে তোষামোদের উপর নির্ভর করে নেতৃত্ব নির্বাচন হবে ততদিন দেশ,জাতি অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকবে, আলোর পথ খুজে পাবে না। ইতিহাস সাক্ষী, যদি ১৯৫২, ১৯৬২,১৯৬৯, ১৯৭১,১৯৮৮-১৯৯০, ১৯৯৬,২০২৪ সালে তোষামোদের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হতো তাহলে এখনো আমরা সেই পরাধিনতার জালে অবদ্ধ থাকতাম।
তাই সাধুরা সাবধান!!সবকিছু সুকৌশলে রেকর্ড হয়েছে এবং হচ্ছে। এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ও অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই প্রিয় নেতৃবৃন্দ।