
জসিম উদ্দিন| কক্সবাজার
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পতনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বিপজ্জনক অংশ পৌঁছে গেছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রধান নবী হোসেনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে। গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন তথ্যানুযায়ী, থানা লুটের অন্তত ১৭টি পিস্তল ইতিমধ্যে এই চক্রের হাতে গেছে এবং আরও অন্তত ১০টি পিস্তলের চালান হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে ও সীমান্তের ওপারে নবী হোসেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এই নেটওয়ার্ক শুধু ইয়াবা ও আইসের মতো মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে না, বরং বিপুল অস্ত্র ও প্রশিক্ষিত সদস্য বাড়িয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ‘স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র’ গঠনের মতো ভয়াবহ চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
৩ হাজার অত্যাধুনিক অস্ত্র ও ভারী রকেটের বিশাল মজুত
বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, নবী হোসেন বাহিনীর কাছে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি আধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
মজুতকৃত অস্ত্রের ধরন: জিএকু-৩ (GQ-3), এম-১৬ (M-16), একে-৪৭ (AK-47)-এর মতো সামরিক গ্রেডের রাইফেল, বিদেশি পিস্তল ও বিভিন্ন বিস্ফোরক।
ভারী অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ: সাধারণ রাইফেলের পাশাপাশি এই বাহিনীর হাতে পৌঁছছে ভারী গ্রেনেড ও রকেটের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র। বর্তমানে সীমান্ত ঘেঁষা গোপন আস্তানায় রকেট লঞ্চারসহ ভারী অস্ত্র চালনার বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
নয়া আস্তানা: কৌশলগত সুবিধার জন্য কক্সবাজার সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের তোতার দ্বীপে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মূল আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছে।স্থানীয় সহযোগী ও অস্ত্র সংগ্রহের পথ
গোপন তথ্যানুসারে, থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র সরাসরি নয়, বরং একাধিক হাত ঘুরে উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত পথ দিয়ে নবী হোসেনের ডেরায় পৌঁছাচ্ছে।
মূল সংগ্রাহক: উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং নবী হোসেনের মাদক ব্যবসার প্রধান ক্যাশিয়ার আবু বশর এই অস্ত্র সংগ্রহের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন।
সহযোগী নেটওয়ার্ক: রাজাপালং গর্জনীয়া এলাকার ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা, ঘুমধুম এলাকার ইলিয়াস মাঝিসহ একদল স্থানীয় ও রোহিঙ্গা দালাল এই অস্ত্র সংগ্রহের কাজে প্রত্যক্ষ সহায়তা দিচ্ছে।
মাদকের কোটি কোটি টাকা ও ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বালুখালী ক্যাম্প-৮ পশ্চিমের বি-ব্লকে আশ্রয় নেওয়া নবী হোসেন ২০১৮ সাল থেকে সীমান্ত পারাপারের ইয়াবা ব্যবসার মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
১. অর্থায়নের উৎস: মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)-এর চোরাচালান এবং অপহরণ বাণিজ্য। ইয়াবালব্ধ আয়ের ৭০ শতাংশ পায় মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ এবং বাকি ৩০ শতাংশের মাধ্যমে নবী হোসেন নিজের অস্ত্র ভাণ্ডার প্রসারিত করেন।
২. অর্থ পাচার: আন্তর্জাতিক হুন্ডি ও বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।
৩. প্রক্সি গ্রুপ ও নতুন জোট: ইতিপূর্বে ২০২২ সালের ২৯ এপ্রিল জাতীয় দৈনিক যুগান্তর-এ “রোহিঙ্গা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা!” শীর্ষক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে এম-১৬ ও একে-৪৭ উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে চক্রান্ত থামেনি; বর্তমানে নবী হোসেনের অনুসারীরা সীমান্ত এলাকায় “প্রক্সি গ্রুপ” হিসেবে কাজ করছে এবং প্রতিপক্ষ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা (ARSA) ও আরাকান আর্মির সাথে পুরনো বিরোধ মেটানোর জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
স্থানীয় প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী (চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউপি):
“নবী হোসেনের হাতে তিন হাজারের চেয়েও অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে বলে আমাদের ধারণা। তার বাহিনীতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে। সীমান্তে এদের দ্রুত দমন না করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”
মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (নিরাপত্তা বিশ্লেষক):
“লুট হওয়া অস্ত্র ও ভারী সরঞ্জাম রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে যাওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেবল নবী হোসেনকে গ্রেপ্তার করলেই চলবে না; অস্ত্রের প্রধান উৎস, রুট ও স্থানীয় সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে মূল নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে হবে।”
প্রশাসনের বক্তব্য:
৮ এপিবিএন-এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত এলাকায় নবী হোসেন গ্রুপসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে এপিবিএন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।