
এনামুল হক রাশেদী, স্টাফ রিপোর্টার
দেশে কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ ধরনের বাসের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন বা নীতিমালাও। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে বছরের পর বছর ধরে যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে বিলাসবহুল এসব বাস। এরই মধ্যে অনুমোদিত সিঙ্গেল-ডেকার বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তরের অভিযোগে ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে বিআরটিএ।
বুধবার হাইকোর্টে দাখিল করা বিআরটিএর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়নি। অথচ মাঠপর্যায়ে এসব বাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিনটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। অননুমোদিত বাসের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদনই যেখানে নেই, সেখানে এসব বাস সড়কে নামল কীভাবে? রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও রুট পারমিটের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বছরের পর বছর এসব বাস যাত্রী নিয়ে দূরপাল্লার রুটে চলাচল করল কীভাবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির বাইরে থাকল কেন?
বিআরটিএর কারিগরি কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু বাস প্রথমে সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নেয়। পরে মালিকরা বডির ধরন পরিবর্তন করে সেগুলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর এমন ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ কাগজপত্রে বাসের যে কাঠামো অনুমোদিত, বাস্তবে সেটির কাঠামো ও ব্যবহার হয়ে গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশ্ন হলো—বডি পরিবর্তনের পর নতুন করে কারিগরি পরীক্ষা ছাড়াই এসব বাস কীভাবে ফিটনেস পেল? রুট পারমিটের সময় বাসের প্রকৃত কাঠামো যাচাই করা হয়নি কেন?
বিআরটিএর ডাটাবেজে ডাবল-ডেকার বাস হিসেবে ৮২৯টি নিবন্ধনের তথ্য রয়েছে। তবে এসব বাস স্লিপার বাস নয়। ফলে নিবন্ধিত এসব বাসের মধ্যে পরবর্তীতে কতটি কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপারে রূপান্তর করা হয়েছে, সেটিও এখন যাচাইয়ের দাবি রাখে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক পরিবহন কোম্পানি বাসের ভেতরে ট্রেনের মতো ওপর-নিচ করে বিছানা বসিয়েছে। কোথাও নিচতলায় ‘বিজনেস ক্লাস সিট’ এবং ওপরতলায় বিছানা তৈরি করে বাসকে স্লিপার হিসেবে চালানো হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধান করে দেখা যায়, ঢাকার গাবতলীর এসএন বডি বিল্ডার্স সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের বলেশ্বর পরিবহনের জন্য এমন দুটি ডাবল-ডেকার বাস তৈরি করেছে। ভারতীয় একটি কোম্পানির ১২ মিটার (১২ এমএফই) চেসিসের ওপর তৈরি করা হয়েছে বাস দুটি। নিচতলায় ২৮টি আসন এবং ওপরতলায় ১৭টি বিছানা রয়েছে। সামনের দিকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরতলায় ওঠানামার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চেসিস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ১২ এমএফই চেসিসে দুই সারিতে দুটি করে ৪৫টি আসন অথবা নির্দিষ্ট বিন্যাসে ৩০টি স্লিপার সিট করা সম্ভব। কিন্তু দোতলা কাঠামো তৈরির কথা সেখানে উল্লেখ নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ছবিতেও চেসিসটির ওপর একতলা বাসের কাঠামোই দেখা যায়।
এসএন বডি বিল্ডার্সের মালিক হাফিজ উদ্দীন জানিয়েছেন, বাস মালিকপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার লাকসানা বাস বডি বিল্ডারের একটি ক্যাটালগ নিয়ে এসেছিলেন। সেটি দেখেই তারা বাস দুটির কাঠামো তৈরি করেছেন। তার দাবি, ডেলিভারির আগে চার-পাঁচ দিন বাস দুটি চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ এসব বাসকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, যেকোনো কোম্পানির চেসিস দেশে আসার পর তার ‘টাইপ অ্যাপ্রুভাল’ নিতে হয়। ওই চেসিসের ওপর কত সিটের এবং কী ধরনের বডি তৈরি করা যাবে, তার অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তার ভাষায়, দেশে আসা কিছু চেসিস মূলত সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে অনুমোদিত। অথচ সেগুলোর ওপর স্থানীয়ভাবে দোতলা বাস বানিয়ে স্লিপার হিসেবে চালানো হচ্ছে। এগুলো শুধু অবৈধ নয়, ঝুঁকিপূর্ণও।
বিআরটিএ যাচাই না করেই এসব বাসের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট দিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তার দাবি, মালিক সমিতির পক্ষ থেকেই বিষয়টি বিআরটিএর নজরে আনা হয়েছে এবং এখন তদন্ত চলছে।
তবে বাসের বডি প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোর্শেদ আলী এর সঙ্গে একমত নন। তার প্রশ্ন—বিদেশ থেকে আনা ডাবল-ডেকার বাস চলতে পারলে দেশে তৈরি বাস কেন চলতে পারবে না?
তার দাবি, দেশে তৈরি বাসের ক্ষেত্রে যদি টাইপ অ্যাপ্রুভালের প্রয়োজন হয়, বিদেশ থেকে আনা বাসের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম থাকা উচিত।
তিনি বলেন, তাদের তৈরি এসব বাস নিয়ে এতদিন কেউ কোনো আপত্তি জানায়নি। বিআরটিএ যদি কোনো কারিগরি ত্রুটি মনে করে, তাহলে তাদের ডেকে বিষয়টি জানানো উচিত। তার দাবি, ১২৩টি গাড়ির তালিকা করা হয়েছে বলে তারা শুনছেন, কিন্তু তাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি বা ডেকে জিজ্ঞাসাও করা হয়নি।
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল হক মনে করেন, সিঙ্গেল-ডেকার বাসের চেসিস এনে তার ওপর ডাবল-ডেকার কাঠামো তৈরি করা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তার মতে, বাসের উচ্চতা বাড়লে ভারকেন্দ্র, স্থিতিশীলতা, ব্রেকিং সক্ষমতা এবং বাঁক নেওয়ার সময় আচরণসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নতুন করে মূল্যায়ন করতে হয়।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এসব বাসের ক্ষেত্রে সেই কারিগরি মূল্যায়ন আদৌ হয়েছে কি না।
স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। চলতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস দাঁড়িয়ে থাকা কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিলে তিনজন নিহত হন। মার্চে দিনাজপুরের বিরামপুরে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে স্লিপার বাসের ধাক্কায় দুজন নিহত হন।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় একটি ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত ছয়জন আহত হন। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় স্লিপার বাসের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা নিহত ও তার নাতনি আহত হন।
এসব দুর্ঘটনার কারণ যে বাসের কাঠামোগত ত্রুটি—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অনুমোদনহীন কাঠামোর যানবাহন কীভাবে নিরাপত্তা পরীক্ষার বাইরে থেকে সড়কে চলাচল করছে, এসব ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরো সামনে এনেছে।
ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস সাধারণ বাসের তুলনায় কাঠামোগতভাবে ভিন্ন। এর উচ্চতা, ভারকেন্দ্র, যাত্রীবহন কাঠামো, বডির বিন্যাস এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশের সব মহাসড়ক, সেতু ও অবকাঠামো কি এ ধরনের উচ্চতার বাস চলাচলের উপযোগী?
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের জ্যামিতিক নকশা নির্দেশনায় নতুন সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উল্লম্ব ছাড়পথের কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত নকশা মানদণ্ডে নতুন সড়ক ও কাঠামোর ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৭ মিটার হেডরুম এবং ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে ওভারব্রিজ, ভায়াডাক্ট ও ফ্লাইওভারের নিচে কমপক্ষে ৫ দশমিক ১০ মিটার উল্লম্ব ছাড়পথের কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু পুরনো সড়ক, সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার, সাইনবোর্ড কিংবা অন্যান্য স্থাপনার উচ্চতা এসব মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা রুটভিত্তিকভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না—সেটিও স্পষ্ট নয়।
একটি বাস রেজিস্ট্রেশন নেয়, ফিটনেস সনদ পায়, রুট পারমিট নেয়, কাউন্টার থেকে যাত্রী তোলে এবং নিয়মিত এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচল করে। পরে যদি দেখা যায়, বাসটির মূল কাঠামোই অনুমোদিত নয়—তাহলে শুধু বাস মালিককে দায়ী করলেই কি দায়িত্ব শেষ?
বডি পরিবর্তন শনাক্ত করার দায়িত্ব কার? ফিটনেস পরীক্ষার সময় পরিবর্তিত কাঠামো ধরা পড়ার কথা নয় কি? রুট পারমিট দেওয়ার সময় বাসের প্রকৃত কাঠামো যাচাই করা হয়েছে কি? মহাসড়কে পুলিশের নিয়মিত তদারকিতে এসব বাসের কাগজপত্র ও কাঠামো পরীক্ষা করা হয়নি কেন?
আর দীর্ঘদিন ধরে এসব বাস চলাচল করলে স্থানীয় প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিআরটিএ ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে। কিন্তু এটাই কি পূর্ণ তালিকা? নাকি একইভাবে আরো বাস সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে পরে বডি পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার হয়েছে—তা এখনো অজানা।
তাই বিআরটিএর ডাটাবেজভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পুনঃপরিদর্শন জরুরি। প্রতিটি বাসের বর্তমান ছবি, চেসিস নম্বর, বডির নকশা, উচ্চতা-প্রস্থ, ওজন, আসন ও বাঙ্কের বিন্যাস, জরুরি বহির্গমন এবং সর্বশেষ ফিটনেস তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোন ওয়ার্কশপে অনুমোদিত বাসের বডি পরিবর্তন করা হয়েছে, কার অনুমোদনে হয়েছে এবং পরিবর্তনের পর কারা ফিটনেস ও রুট পারমিট দিয়েছে—এসব তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা দরকার।
বিআরটিএ জানিয়েছে, উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরির কার্যক্রম চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের নীতিমালায় শুধু বাসের নকশা নয়; সর্বোচ্চ উচ্চতা ও প্রস্থ, ভারকেন্দ্র, ব্রেকিং সক্ষমতা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনিরাপত্তা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, চালকের দৃষ্টিসীমা, বডি পরিবর্তনের অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট রুটের সড়ক-সেতুর সক্ষমতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
কারণ একটি বাস নিরাপদ কি না, তা শুধু বাসের ওপর নির্ভর করে না। বাস, চালক, সড়ক, সেতু, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই নিশ্চিত করতে পারে নিরাপদ যাত্রী পরিবহন।
হাইকোর্টে বিআরটিএর প্রতিবেদন নতুন করে যে প্রশ্ন সামনে এনেছে তা হলো—অনুমোদনহীন ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস যদি সড়কে চলেই থাকে, তাহলে এতদিন কার নজরদারিতে, কার অনুমোদনে এবং কার ছত্রছায়ায় চলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিতের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে যাতে কাগজে এক ধরনের আর বাস্তবে অন্য ধরনের গণপরিবহন সড়কে নামতে না পারে, তার কার্যকর ব্যবস্থা।